স্বাস্থ্য বার্তা

 


বিশ্বে এইচআইভি সংক্রমণ ও এইডসে মৃত্যু কমছে। তবে বাংলাদেশে প্রতিবছর এইচআইভি/এইডস আক্রান্ত ব্যক্তির সংখ্যা যেমন বাড়ছে, তেমনি বাড়ছে এই রোগে মৃত্যু। সরকারি সংস্থা ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কথা বলে এই তথ্য পাওয়া গেছে।

এইডস প্রতিরোধে জাতীয় কর্মসূচির সঙ্গে যুক্ত একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে প্রথম আলোকে বলেছেন, এইচআইভি/এইডস কর্মসূচির দুর্বলতার কারণে সংক্রমণ ও মৃত্যু দুটোই বাড়ছে। যৌনকর্মী, মাদকসেবীর মতো ঝুঁকিপূর্ণ সব জনগোষ্ঠীর কাছে সেবা পৌঁছানো যাচ্ছে না। উদাহরণ হিসেবে তিনি বলেন, শিরায় মাদক গ্রহণকারীদের ৮০ শতাংশকে সেবার আওতায় আনলে নতুন সংক্রমণ রোধ করা সম্ভব। বর্তমানে দেশে শিরায় মাদক গ্রহণকারীর সংখ্যা ৩৩ হাজার। তাঁদের মধ্যে ১১ হাজার জনকে সেবা দেওয়া সম্ভব হচ্ছে।
এরই মধ্যে এইচআইভি/এইডস কর্মসূচিকে যক্ষ্মা নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচির সঙ্গে যুক্ত করার উদ্যোগ নিয়েছে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়। এই উদ্যোগে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন এই রোগ নিয়ে কাজ করে এমন বেসরকারি সংস্থার কর্তাব্যক্তিরা।
এই প্রেক্ষাপটে দেশে আজ বিশ্ব এইডস দিবস পালিত হচ্ছে। সরকারের জাতীয় এইডস/এসটিডি কর্মসূচি রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে সেমিনার ও শোভাযাত্রার আয়োজন করেছে। এ বছর এইডস প্রতিরোধের উদ্যোগগুলোকে সমর্থন জানানোর ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। জাতিসংঘের এইডস-বিষয়ক সংস্থা ইউএন এইডস বলেছে, কিশোরী ও অল্পবয়সী নারী, ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠী এবং এইচআইভি সংক্রমিত ব্যক্তিদের বিষয়ে বেশি মনোযোগী হতে হবে।
সংক্রমণ বাড়ছে: বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলছে, দক্ষিণ এশিয়ায় ২০১০ সালের তুলনায় ২০১৫ সালে এইচআইভির সংক্রমণ ৪৭ শতাংশ কমেছে। সেই সঙ্গে এইডসে মৃত্যুও কমেছে। আর ইউএন এইডসের হিসাবে সারা বিশ্বে ২০০০ সাল থেকে গত বছর পর্যন্ত সংক্রমণ কমেছে ৩৫ শতাংশ। ২০০৪ সাল থেকে গত বছর পর্যন্ত এই রোগে সারা বিশ্বে মৃত্যু কমেছে ৪২ শতাংশ।
সরকারের হিসাবে দেশে বর্তমানে এইচআইভি/এইডস আক্রান্ত ব্যক্তির অনুমিত সংখ্যা ১০ হাজার। এর মধ্যে ২০১৫ সাল পর্যন্ত শনাক্ত রোগীর সংখ্যা ৩ হাজার ৪৮৫।
গত কয়েক বছরে শনাক্ত হওয়া রোগী বাড়ছে। ২০১৩ সালে শনাক্ত হয়েছিল ৩৭০ জন, ২০১৪ সালে ৪৩৩ জন। আর ২০১৫ সালে বেড়ে হয়েছিল ৪৬৯ জন। সরকারি ও বেসরকারি সূত্র জানিয়েছে, ২০১৬ সালে শনাক্ত হয়েছে প্রায় ৬০০ জন।
এইডসে মৃত্যুর সংখ্যাও প্রতিবছর বাড়ছে। ২০১৫ সাল পর্যন্ত এই রোগে ৬৫৮ জন মারা গেছে। এর মধ্যে ২০১৩ সালে ৮২ জন, ২০১৪ সালে ৯১ জন এবং ২০১৫ সালে ৯৫ জন মারা গেছে। সরকারি ও বেসরকারি সূত্র জানিয়েছে, ২০১৬ সালে মারা গেছে ১০০ জনের বেশি।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কোনো রোগে একটি নির্দিষ্ট জনগোষ্ঠীর ৫ শতাংশের বেশি আক্রান্ত হলে পরিস্থিতিকে ‘কেন্দ্রীভূত মহামারি’ বলে। সরকারের ২০১১ সালের রক্তের নমুনা জরিপে (সেরো সার্ভিল্যান্স) দেখা গিয়েছিল, ঢাকা 
শহরে শিরায় মাদক গ্রহণকারী ব্যক্তিদের ৫ দশমিক ৩ শতাংশ এইচআইভি/এইডসে আক্রান্ত। পাঁচ বছর পরে পরিস্থিতি আরও নাজুক হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন।
সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান (আইইডিসিআর) এবং আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা প্রতিষ্ঠান, বাংলাদেশ (আইসিডিডিআরবি) এ বছরও রক্তের নমুনা নিয়ে জরিপ করেছে। জরিপ-সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র জানিয়েছে, শিরায় মাদক গ্রহণকারী ব্যক্তিদের মধ্যে সংক্রমণের হার আগের চেয়ে অনেক বেশি।
জাতীয় কর্মসূচির পরিচালক আনিসুর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, ‘আগের তুলনায় আমাদের রোগ শনাক্ত করার সুযোগ বেড়েছে। এ কারণে শনাক্ত হওয়া রোগী বাড়ছে। তবে তিনি কর্মসূচিতেও কিছু দুর্বলতা রয়েছে বলে স্বীকার করেন।’
কর্মসূচি নিয়ে উদ্বেগ: স্বাস্থ্য, জনসংখ্যা ও পুষ্টি উন্নয়ন কর্মসূচির আওতায় ৩২টি কার্য পরিকল্পনা (অপারেশনাল প্ল্যান-ওপি) বাস্তবায়ন করছে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়। যক্ষ্মা ও এইচআইভি/এইডস নিয়ে কাজ চলছে পৃথক দুটি ওপির মাধ্যমে। এই দুটিকে এক করার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার।
এ ব্যাপারে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক আবুল কালাম আজাদ বলেন, ‘এইডস ও যক্ষ্মাকে একটি ওপির আওতায় আনার আলোচনা চলছে। তবে বিষয়টি এখনো চূড়ান্ত হয়নি।’
তবে এইডস/এসডিটি কর্মসূচির লাইন ডিরেক্টর আনিসুর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমরা শুনেছি এইডসের জন্য আর পৃথক ওপি থাকছে না। তবে আনুষ্ঠানিকভাবে আমাদের কিছু জানানো হয়নি।’
আশার আলো সোসাইটি এইচআইভি/এইডস আক্রান্ত ব্যক্তিদের চিকিৎসাসেবা দিয়ে আসছে প্রায় দেড় দশক ধরে। প্রতিষ্ঠানের নির্বাহী পরিচালক হাবিবা আক্তার প্রথম আলোকে বলেন, ‘যক্ষ্মা নিয়ন্ত্রণ অনেক বড় কর্মসূচি। যক্ষ্মার সঙ্গে যুক্ত করলে এইচআইভি/এইডস নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচি দৃষ্টির আড়ালে পড়ে যাবে। এতে ঝুঁকি অনেক বেড়ে যাবে।’
মুক্ত আকাশ বাংলাদেশও এইচআইভি/এইডস আক্রান্ত ব্যক্তিদের সেবা দেয়। সংস্থাটির নির্বাহী পরিচালক এস এম মুক্তি প্রথম আলোকে বলেন, ‘যক্ষ্মা ও এইচআইভি/এইডস রোগের চিকিৎসা ও চিকিৎসার আয়োজন ভিন্ন। আমরা এত বছর সেবা দিয়ে আসছি। কিন্তু সরকার আমাদের সঙ্গে পরামর্শ না করেই কর্মসূচিতে পরিবর্তন আনছে। 

0 comments:

Post a Comment

Popular Posts

Powered by Blogger.

Category

Most Viewed

Video Of the Day

Facebook

 
Copyright © 2014 Daily fresh news
Blogger Templates