রাখাইন রাজ্যে রোহিঙ্গা নিপীড়নের অভিযোগে ধীরে ধীরে মিয়ানমারের ওপর আন্তর্জাতিক চাপ বাড়ছে। নিজেদের এই চাপকে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করতে উল্টো এখন বাংলাদেশ সম্পর্কে অপপ্রচারে নেমেছে গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত মিয়ানমার সরকার। রাখাইন রাজ্যের রোহিঙ্গাদের নিয়ে বাংলাদেশ অযথা অপপ্রচার চালাচ্ছে এবং সমস্যা নিয়ে মিয়ানমারের সঙ্গে কোনো আলোচনায় বসেনি বলে তারা প্রচার চালাচ্ছে। অথচ বাংলাদেশের সঙ্গে সামরিক বাহিনী ও সীমান্তরক্ষী বাহিনী পর্যায়ের দুটি আলোচনা পিছিয়ে দিয়েছে মিয়ানমার। কূটনৈতিক সূত্রগুলোর সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, আগামী মাসে মালয়েশিয়ায় ওআইসি পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের বৈঠকের আগে নোবেল পুরস্কার বিজয়ী বিশ্বের ১৩ জন বিশিষ্ট নাগরিকের বিবৃতি মিয়ানমারের জন্য নতুন করে অস্বস্তি তৈরি করেছে।
বাংলাদেশকে নিয়ে অপপ্রচার চালানোর পাশাপাশি রোহিঙ্গাদের চিরতরে তাদের স্বদেশে অবৈধ করার অংশ হিসেবে গত বুধবার থেকে বাড়িভিত্তিক শুমারি শুরু করেছে অং সান সু চির সরকার। জাতিসংঘের মানবিক সম্পর্কবিষয়ক সমন্বয় দপ্তরের এক তথ্যে জানা গেছে, রাখাইনে শুরু হওয়া এই শুমারিতে কোনো বাড়িতে গিয়ে কাউকে না পেলে তাকে চিরদিনের জন্য মিয়ানমারের অবৈধ নাগরিক হিসেবে গণ্য করা হবে।
বাংলাদেশ ও রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে মিয়ানমারের তৎপরতার মাঝেও দেশটি থেকে সংখ্যালঘু মুসলিমদের আসা গতকাল শুক্রবারও অব্যাহত ছিল। গতকাল বেলা তিনটা পর্যন্ত টেকনাফ ও উখিয়ায় অন্তত ৫০০ রোহিঙ্গা এসেছে। বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) টেকনাফে রোহিঙ্গাবোঝাই তিনটি নৌকা ও উখিয়ায় ৭৬ রোহিঙ্গাকে প্রতিহত করেছে।
উখিয়ার কুতুপালংয়ে মিয়ানমারের অনিবন্ধিত নাগরিকদের শিবিরের ব্যবস্থাপনা কমিটির সভাপতি আবু ছিদ্দিক ও লেদার অন্য শিবিরটির সভাপতি দুদু মিয়ার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, দুই শিবিরে নতুন করে ঢুকেছে অন্তত পাঁচ শতাধিক রোহিঙ্গা। নতুন আসা রোহিঙ্গার ক্যাম্পে জায়গা না পেয়ে অধিকাংশ টেকনাফ ও উখিয়ার বিভিন্ন গ্রামে ও কক্সবাজারের দিকে চলে যাচ্ছে।
ইয়াঙ্গুন থেকে রয়টার্স জানিয়েছে, বাংলাদেশে চলে আসা ২ হাজার ৪১৫ জন নাগরিককে ফেরত নেবে মিয়ানমার। গতকাল শুক্রবার মিয়ানমারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা বলেন, তাঁদের কাছে থাকা তথ্য অনুযায়ী, দেশত্যাগী মিয়ানমারের নাগরিকের সংখ্যা ২ হাজার ৪১৫। বাংলাদেশ কী সংখ্যা বলছে, সে ব্যাপারে তাঁদের কোনো ধারণা নেই।
ইয়াঙ্গুনের কূটনৈতিক সূত্রে যোগাযোগ করে জানা গেছে, রাখাইন রাজ্যে সশস্ত্র বাহিনীর ভয়ে বনে-জঙ্গলে পালিয়ে যাওয়া রোহিঙ্গারা নতুন পথ দিয়ে বাংলাদেশে যাচ্ছে। বনে-জঙ্গলে পালিয়ে যাওয়া রোহিঙ্গারা রাখাইন রাজ্যের আরও উত্তরে সরে গিয়ে বান্দরবানের আলীকদমের দক্ষিণে মাতামুহুরি অভয়ারণ্যকে নতুন রুট হিসেবে ব্যবহারের চেষ্টা চালাচ্ছে।
ঢাকা ও ইয়াঙ্গুনের কূটনৈতিক সূত্রগুলোতে গত তিন দিন যোগাযোগ করে জানা গেছে, নিজেদের ওপর থেকে আন্তর্জাতিক চাপ সরিয়ে নিতে মিয়ানমার এখন বিভিন্ন দেশকে বলছে, রাখাইনের পরিস্থিতি স্বাভাবিক আছে। তবে বাংলাদেশ বিষয়টি নিয়ে অপপ্রচার চালাচ্ছে। অথচ এ নিয়ে তাদের সঙ্গে কোনো রকম আলোচনায় বসতে চাইছে না বাংলাদেশ। সম্প্রতি ইয়াঙ্গুনে বাংলাদেশের নিকট প্রতিবেশীসহ বাংলাদেশের একাধিক বন্ধুদেশের কাছে মিয়ানমার এমন কথা বলেছে। অথচ বাস্তবতা হচ্ছে, বাংলাদেশের সঙ্গে সামরিক বাহিনী ও সীমান্তরক্ষী বাহিনীর দুটি আলোচনা মিয়ানমারের কারণে স্থগিত হয়ে গেছে।
১৯ ডিসেম্বর ইয়াঙ্গুনে আসিয়ান পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের বৈঠকের পর রোহিঙ্গা নির্যাতন নিয়ে আন্তর্জাতিক জনমত জোরদার হচ্ছে। বিশেষ করে, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্যসহ পাশ্চাত্যের প্রভাবশালী বিভিন্ন দেশ প্রকাশ্যে তেমন সোচ্চার না হলেও মানবাধিকার সংগঠন, আন্তর্জাতিক ব্যক্তিত্ব এ নিয়ে সরব হতে শুরু করেছেন। এমন এক পরিস্থিতিতে আগামী ১৯ জানুয়ারি মালয়েশিয়ার কুয়ালালামপুরে ওআইসির (ইসলামি সহযোগিতা সংস্থা) পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের বৈঠকে অনেক দেশই রোহিঙ্গা নির্যাতন নিয়ে যে সোচ্চার হবে, সেই আভাস মিলছে। ফলে মিয়ানমারের পক্ষে আসিয়ানের অন্যতম প্রভাবশালী দেশ ইন্দোনেশিয়া বিষয়টিকে আলোচনার টেবিলে কম গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় রাখার চেষ্টা করেছিল। এখনকার পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে ইন্দোনেশিয়া আপাতত ওআইসির মন্ত্রীদের আলোচনায় নিরপেক্ষ অবস্থান নেওয়ার কথা ভাবছে।
এদিকে শুধু অপপ্রচারই নয়, বাংলাদেশের সঙ্গে সীমান্তে উসকানিমূলক আচরণের চেষ্টা অব্যাহত রেখেছে মিয়ানমার। রোহিঙ্গাদের রাজনৈতিক অধিকার থেকে বঞ্চিত করতে সেখানে সামরিক অভিযান চালিয়ে যাচ্ছে। ২৭ ডিসেম্বর সেন্ট মার্টিনের কাছে বাংলাদেশের জলসীমায় ঢুকে বাংলাদেশের জেলেদের ওপর হামলা এই তৎপরতার অংশ বলে মনে করছে বাংলাদেশ।
রোহিঙ্গাদের অবৈধ করতে নতুন উদ্যোগ: রাখাইনে ব্যাপক হারে রোহিঙ্গা নিধনের অভিযোগ উড়িয়ে দেওয়ার পর সংখ্যালঘু ওই জনগোষ্ঠীকে স্থায়ীভাবে অবৈধ করার নতুন পরিকল্পনা বাস্তবায়ন শুরু করেছে দেশটির নতুন নির্বাচিত সরকার। গত বৃহস্পতিবার থেকে রাখাইনের বাড়ি বাড়ি গিয়ে নতুন করে শুমারি শুরু হয়েছে। শুমারি চলার সময় যাদের পাওয়া যাবে না, তাদেরই অবৈধ করার ঘোষণা দিয়েছে মিয়ানমার সরকার। অং সান সুচির দল এনএলডি সরকারের এই সিদ্ধান্তে স্পষ্ট যে রোহিঙ্গা নিধনের জন্য সেনা নেতৃত্বের দৃষ্টিভঙ্গির সঙ্গে সমান্তরালে ভূমিকা রাখছে দেশটির রাজনৈতিক নেতৃত্ব।
রোহিঙ্গাদের মিয়ানমার নিজের নাগরিক হিসেবে স্বীকৃতি না দিলেও বাংলাদেশের সঙ্গে ১৯৭৮-এ সই হওয়া প্রত্যাবাসন চুক্তি বলছে ভিন্ন কথা। ঢাকায় ১৯৭৮ সালের ৯ জুলাই সই হওয়া ওই চুক্তিতে মিয়ানমার স্পষ্ট করেই বলেছিল, রোহিঙ্গারা মিয়ানমারেরই নাগরিক।
অনুপ্রবেশের ২১টি পয়েন্ট: রাখাইন রাজ্যে মিয়ানমারের সশস্ত্র বাহিনীর অভিযানের কারণে নাফ নদী ও স্থলপথ অতিক্রম করে কক্সবাজারের টেকনাফ ও উখিয়া উপজেলার বিভিন্ন সীমান্ত পয়েন্ট দিয়ে রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশ অব্যাহত রয়েছে। বিজিবির দাবি, মিয়ানমার থেকে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গা শিশু, নারী ও পুরুষেরা টেকনাফ ও উখিয়ার এ দুই উপজেলার ২১টি পয়েন্ট দিয়ে অনুপ্রবেশের চেষ্টা চালাচ্ছেন।
বিজিবি সূত্রে জানা গেছে, নভেম্বরের শুরু থেকে ৩০ ডিসেম্বর পর্যন্ত টেকনাফের আনোয়ার মৎস্য খামার, ২ নম্বর¯ইসগেট, ৬ নম্বর¬ইসগেট, ৭ নম্বর¬ইসগেট, লম্বাবিল, তুলাতলি, লম্বাবিল হাউসের দিয়া, কাটাখালী, উলুবনিয়া, ঝিমংখালী, ওয়াব্রাং, লেদা, মোচনি, দমদমিয়া ও উখিয়ার থাইল্যান্ড, পালংখালী, বালুখালী, ঘুমধুম, তমব্রু, আছারতলি, চাকডালা সীমান্ত পয়েন্ট দিয়ে প্রতিদিন রোহিঙ্গারা নৌকা ও হেঁটে অনুপ্রবেশের চেষ্টা চালাচ্ছে। বিজিবি এ পয়েন্টগুলো প্রাথমিকভাবে চিহ্নিত করে ওই সব পয়েন্টে বিজিবির টহল বাড়ানো হয়েছে।
টেকনাফ ২ বিজিবির অধিনায়ক লে. কর্নেল আবুজার আল জাহিদ গতকাল প্রথম আলোকে বলেন, ১ নভেম্বরে থেকে ৩০ ডিসেম্বর পর্যন্ত টেকনাফের নাফ নদীর ১৪টি পয়েন্ট দিয়ে ৩৮২টি নৌকায় চার হাজার ২৫০ জন রোহিঙ্গা শিশু, নারী ও পুরুষকে প্রতিহত করা হয়েছে। তাঁর দাবি, নাফ নদী দিয়ে যাদের প্রতিহত করা হয়েছে, তার চার গুণ বেশি হবে। তিনি আরও বলেন, রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশে সহায়তাকারী ১৬ জন দালালকে আটক করে পুলিশে সোপর্দ করা হলে তাদের ভ্রাম্যমাণ আদালত বিভিন্ন মেয়াদে সাজা দিয়ে কারাগারে পাঠান।
কক্সবাজার ৩৪ বিজিবির উখিয়া সীমান্তের দায়িত্বে থাকা অধিনায়ক লে. কর্নেল ইমরান উল্লাহ সরকার গতকাল প্রথম আলোকে বলেন, উখিয়ার স্থলপথ দিয়ে ঢোকার চেষ্টার সময় ডিসেম্বরে ৩৪০ ও নভেম্বর ৪৮২ জন রোহিঙ্গাকে প্রতিহত করা হয়েছে। সীমান্তের যেসব এলাকা দিয়ে রোহিঙ্গারা ঢোকার চেষ্টা অব্যাহত রেখেছে, সেখানে বিজিবির টহল জোরদারের পাশাপাশি নজরদারিও বাড়ানো হয়েছে।
বাংলাদেশকে নিয়ে অপপ্রচার চালানোর পাশাপাশি রোহিঙ্গাদের চিরতরে তাদের স্বদেশে অবৈধ করার অংশ হিসেবে গত বুধবার থেকে বাড়িভিত্তিক শুমারি শুরু করেছে অং সান সু চির সরকার। জাতিসংঘের মানবিক সম্পর্কবিষয়ক সমন্বয় দপ্তরের এক তথ্যে জানা গেছে, রাখাইনে শুরু হওয়া এই শুমারিতে কোনো বাড়িতে গিয়ে কাউকে না পেলে তাকে চিরদিনের জন্য মিয়ানমারের অবৈধ নাগরিক হিসেবে গণ্য করা হবে।
বাংলাদেশ ও রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে মিয়ানমারের তৎপরতার মাঝেও দেশটি থেকে সংখ্যালঘু মুসলিমদের আসা গতকাল শুক্রবারও অব্যাহত ছিল। গতকাল বেলা তিনটা পর্যন্ত টেকনাফ ও উখিয়ায় অন্তত ৫০০ রোহিঙ্গা এসেছে। বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) টেকনাফে রোহিঙ্গাবোঝাই তিনটি নৌকা ও উখিয়ায় ৭৬ রোহিঙ্গাকে প্রতিহত করেছে।
উখিয়ার কুতুপালংয়ে মিয়ানমারের অনিবন্ধিত নাগরিকদের শিবিরের ব্যবস্থাপনা কমিটির সভাপতি আবু ছিদ্দিক ও লেদার অন্য শিবিরটির সভাপতি দুদু মিয়ার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, দুই শিবিরে নতুন করে ঢুকেছে অন্তত পাঁচ শতাধিক রোহিঙ্গা। নতুন আসা রোহিঙ্গার ক্যাম্পে জায়গা না পেয়ে অধিকাংশ টেকনাফ ও উখিয়ার বিভিন্ন গ্রামে ও কক্সবাজারের দিকে চলে যাচ্ছে।
ইয়াঙ্গুন থেকে রয়টার্স জানিয়েছে, বাংলাদেশে চলে আসা ২ হাজার ৪১৫ জন নাগরিককে ফেরত নেবে মিয়ানমার। গতকাল শুক্রবার মিয়ানমারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা বলেন, তাঁদের কাছে থাকা তথ্য অনুযায়ী, দেশত্যাগী মিয়ানমারের নাগরিকের সংখ্যা ২ হাজার ৪১৫। বাংলাদেশ কী সংখ্যা বলছে, সে ব্যাপারে তাঁদের কোনো ধারণা নেই।
ইয়াঙ্গুনের কূটনৈতিক সূত্রে যোগাযোগ করে জানা গেছে, রাখাইন রাজ্যে সশস্ত্র বাহিনীর ভয়ে বনে-জঙ্গলে পালিয়ে যাওয়া রোহিঙ্গারা নতুন পথ দিয়ে বাংলাদেশে যাচ্ছে। বনে-জঙ্গলে পালিয়ে যাওয়া রোহিঙ্গারা রাখাইন রাজ্যের আরও উত্তরে সরে গিয়ে বান্দরবানের আলীকদমের দক্ষিণে মাতামুহুরি অভয়ারণ্যকে নতুন রুট হিসেবে ব্যবহারের চেষ্টা চালাচ্ছে।
ঢাকা ও ইয়াঙ্গুনের কূটনৈতিক সূত্রগুলোতে গত তিন দিন যোগাযোগ করে জানা গেছে, নিজেদের ওপর থেকে আন্তর্জাতিক চাপ সরিয়ে নিতে মিয়ানমার এখন বিভিন্ন দেশকে বলছে, রাখাইনের পরিস্থিতি স্বাভাবিক আছে। তবে বাংলাদেশ বিষয়টি নিয়ে অপপ্রচার চালাচ্ছে। অথচ এ নিয়ে তাদের সঙ্গে কোনো রকম আলোচনায় বসতে চাইছে না বাংলাদেশ। সম্প্রতি ইয়াঙ্গুনে বাংলাদেশের নিকট প্রতিবেশীসহ বাংলাদেশের একাধিক বন্ধুদেশের কাছে মিয়ানমার এমন কথা বলেছে। অথচ বাস্তবতা হচ্ছে, বাংলাদেশের সঙ্গে সামরিক বাহিনী ও সীমান্তরক্ষী বাহিনীর দুটি আলোচনা মিয়ানমারের কারণে স্থগিত হয়ে গেছে।
১৯ ডিসেম্বর ইয়াঙ্গুনে আসিয়ান পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের বৈঠকের পর রোহিঙ্গা নির্যাতন নিয়ে আন্তর্জাতিক জনমত জোরদার হচ্ছে। বিশেষ করে, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্যসহ পাশ্চাত্যের প্রভাবশালী বিভিন্ন দেশ প্রকাশ্যে তেমন সোচ্চার না হলেও মানবাধিকার সংগঠন, আন্তর্জাতিক ব্যক্তিত্ব এ নিয়ে সরব হতে শুরু করেছেন। এমন এক পরিস্থিতিতে আগামী ১৯ জানুয়ারি মালয়েশিয়ার কুয়ালালামপুরে ওআইসির (ইসলামি সহযোগিতা সংস্থা) পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের বৈঠকে অনেক দেশই রোহিঙ্গা নির্যাতন নিয়ে যে সোচ্চার হবে, সেই আভাস মিলছে। ফলে মিয়ানমারের পক্ষে আসিয়ানের অন্যতম প্রভাবশালী দেশ ইন্দোনেশিয়া বিষয়টিকে আলোচনার টেবিলে কম গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় রাখার চেষ্টা করেছিল। এখনকার পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে ইন্দোনেশিয়া আপাতত ওআইসির মন্ত্রীদের আলোচনায় নিরপেক্ষ অবস্থান নেওয়ার কথা ভাবছে।
এদিকে শুধু অপপ্রচারই নয়, বাংলাদেশের সঙ্গে সীমান্তে উসকানিমূলক আচরণের চেষ্টা অব্যাহত রেখেছে মিয়ানমার। রোহিঙ্গাদের রাজনৈতিক অধিকার থেকে বঞ্চিত করতে সেখানে সামরিক অভিযান চালিয়ে যাচ্ছে। ২৭ ডিসেম্বর সেন্ট মার্টিনের কাছে বাংলাদেশের জলসীমায় ঢুকে বাংলাদেশের জেলেদের ওপর হামলা এই তৎপরতার অংশ বলে মনে করছে বাংলাদেশ।
রোহিঙ্গাদের অবৈধ করতে নতুন উদ্যোগ: রাখাইনে ব্যাপক হারে রোহিঙ্গা নিধনের অভিযোগ উড়িয়ে দেওয়ার পর সংখ্যালঘু ওই জনগোষ্ঠীকে স্থায়ীভাবে অবৈধ করার নতুন পরিকল্পনা বাস্তবায়ন শুরু করেছে দেশটির নতুন নির্বাচিত সরকার। গত বৃহস্পতিবার থেকে রাখাইনের বাড়ি বাড়ি গিয়ে নতুন করে শুমারি শুরু হয়েছে। শুমারি চলার সময় যাদের পাওয়া যাবে না, তাদেরই অবৈধ করার ঘোষণা দিয়েছে মিয়ানমার সরকার। অং সান সুচির দল এনএলডি সরকারের এই সিদ্ধান্তে স্পষ্ট যে রোহিঙ্গা নিধনের জন্য সেনা নেতৃত্বের দৃষ্টিভঙ্গির সঙ্গে সমান্তরালে ভূমিকা রাখছে দেশটির রাজনৈতিক নেতৃত্ব।
রোহিঙ্গাদের মিয়ানমার নিজের নাগরিক হিসেবে স্বীকৃতি না দিলেও বাংলাদেশের সঙ্গে ১৯৭৮-এ সই হওয়া প্রত্যাবাসন চুক্তি বলছে ভিন্ন কথা। ঢাকায় ১৯৭৮ সালের ৯ জুলাই সই হওয়া ওই চুক্তিতে মিয়ানমার স্পষ্ট করেই বলেছিল, রোহিঙ্গারা মিয়ানমারেরই নাগরিক।
অনুপ্রবেশের ২১টি পয়েন্ট: রাখাইন রাজ্যে মিয়ানমারের সশস্ত্র বাহিনীর অভিযানের কারণে নাফ নদী ও স্থলপথ অতিক্রম করে কক্সবাজারের টেকনাফ ও উখিয়া উপজেলার বিভিন্ন সীমান্ত পয়েন্ট দিয়ে রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশ অব্যাহত রয়েছে। বিজিবির দাবি, মিয়ানমার থেকে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গা শিশু, নারী ও পুরুষেরা টেকনাফ ও উখিয়ার এ দুই উপজেলার ২১টি পয়েন্ট দিয়ে অনুপ্রবেশের চেষ্টা চালাচ্ছেন।
বিজিবি সূত্রে জানা গেছে, নভেম্বরের শুরু থেকে ৩০ ডিসেম্বর পর্যন্ত টেকনাফের আনোয়ার মৎস্য খামার, ২ নম্বর¯ইসগেট, ৬ নম্বর¬ইসগেট, ৭ নম্বর¬ইসগেট, লম্বাবিল, তুলাতলি, লম্বাবিল হাউসের দিয়া, কাটাখালী, উলুবনিয়া, ঝিমংখালী, ওয়াব্রাং, লেদা, মোচনি, দমদমিয়া ও উখিয়ার থাইল্যান্ড, পালংখালী, বালুখালী, ঘুমধুম, তমব্রু, আছারতলি, চাকডালা সীমান্ত পয়েন্ট দিয়ে প্রতিদিন রোহিঙ্গারা নৌকা ও হেঁটে অনুপ্রবেশের চেষ্টা চালাচ্ছে। বিজিবি এ পয়েন্টগুলো প্রাথমিকভাবে চিহ্নিত করে ওই সব পয়েন্টে বিজিবির টহল বাড়ানো হয়েছে।
টেকনাফ ২ বিজিবির অধিনায়ক লে. কর্নেল আবুজার আল জাহিদ গতকাল প্রথম আলোকে বলেন, ১ নভেম্বরে থেকে ৩০ ডিসেম্বর পর্যন্ত টেকনাফের নাফ নদীর ১৪টি পয়েন্ট দিয়ে ৩৮২টি নৌকায় চার হাজার ২৫০ জন রোহিঙ্গা শিশু, নারী ও পুরুষকে প্রতিহত করা হয়েছে। তাঁর দাবি, নাফ নদী দিয়ে যাদের প্রতিহত করা হয়েছে, তার চার গুণ বেশি হবে। তিনি আরও বলেন, রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশে সহায়তাকারী ১৬ জন দালালকে আটক করে পুলিশে সোপর্দ করা হলে তাদের ভ্রাম্যমাণ আদালত বিভিন্ন মেয়াদে সাজা দিয়ে কারাগারে পাঠান।
কক্সবাজার ৩৪ বিজিবির উখিয়া সীমান্তের দায়িত্বে থাকা অধিনায়ক লে. কর্নেল ইমরান উল্লাহ সরকার গতকাল প্রথম আলোকে বলেন, উখিয়ার স্থলপথ দিয়ে ঢোকার চেষ্টার সময় ডিসেম্বরে ৩৪০ ও নভেম্বর ৪৮২ জন রোহিঙ্গাকে প্রতিহত করা হয়েছে। সীমান্তের যেসব এলাকা দিয়ে রোহিঙ্গারা ঢোকার চেষ্টা অব্যাহত রেখেছে, সেখানে বিজিবির টহল জোরদারের পাশাপাশি নজরদারিও বাড়ানো হয়েছে।


0 comments:
Post a Comment